যমুনার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক শিশুর চোখে আতঙ্ক। তার একটাই প্রশ্ন,“আমাদের ঘরটা কি এবারও নদীতে চলে যাবে?”
‎সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার হাজারো মানুষের কাছে এই প্রশ্ন নতুন নয়। বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা যমুনা নদীর ভয়াল ভাঙনের সঙ্গে এক অসম যুদ্ধ লড়ে যাচ্ছে। সরকার বদলেছে, জনপ্রতিনিধি বদলেছে, উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি এসেছে; কিন্তু বদলায়নি চৌহালীর মানুষের ভাগ্য। যমুনার একের পর এক আঘাতে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল কবরস্থান, ফসলি জমি এবং মানুষের জীবনভর গড়ে তোলা স্বপ্ন।
‎সম্প্রতি উপজেলার চর সলিমাবাদ এলাকায় আবারও নতুন করে নদীভাঙন শুরু হয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীতীরবর্তী শত শত পরিবার এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কখন নদী গিলে খাবে শেষ সম্বলটুকু—সেই শঙ্কায় নির্ঘুম রাত পার করছেন তারা।

‎স্মৃতির সঙ্গে ভেঙে যায় জীবন

‎বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত শিকদার বলেন, “ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে নদীভাঙনের অসংখ্য গল্প শুনেছি। মানুষের দুর্ভোগের কথা জেনেছি। কিন্তু কখনো ভাবিনি সেই ভয়াবহতার মুখোমুখি আমাকেও হতে হবে। ২০১৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালে যখন পুরো দেশ উৎসবে মেতেছিল, তখন আমাদের এলাকায় শুরু হয়েছিল ভয়াবহ নদীভাঙন। আমাদের বাড়ি, পুকুর, ফলের বাগান, মসজিদ ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িসহ সবকিছু নদীতে হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় আমার শৈশবের স্মৃতিও।”
‎তিনি আরও বলেন, “একসময় আমাদের বাড়িতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ আশ্রয় নিত। কিন্তু একদিন আমরাই আশ্রয়হীন হয়ে পড়ি। বহুবার টেকসই বেড়িবাঁধের দাবি তুলেছি, কিন্তু কোনো ফল পাইনি। অনেক নেতা-মন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি।”
‎ইয়াসিনের অভিজ্ঞতা যেন চৌহালীর হাজারো নদীভাঙনকবলিত মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি।

‎স্থায়ী সমাধানের দাবিতে চৌহালীবাসী

‎বিনানই গ্রামের বাসিন্দা মো. মুত্তাকিন বলেন, “সরকার বদলায়, কিন্তু চৌহালীর মানুষের ভাগ্য বদলায় না। প্রতি বছর নদীভাঙনে মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। অথচ একটি স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ বাঁধ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।”
‎তিনি বলেন, “চৌহালীর মানুষ কোনো করুণা চায় না, তারা চায় নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার। তাই দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি কার্যকর ও স্থায়ী নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।”

‎হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম

‎স্থানীয়দের দাবি, গত প্রায় দেড় দশকে চৌহালী উপজেলার ২০ থেকে ৩০টিরও বেশি গ্রাম আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে। অসংখ্য পরিবার একাধিকবার বসতভিটা স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়েছে।
‎চৌহালীর বাঘুটিয়া, খাসপুখুরিয়া, ঘোরজান ও উমারপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্তমানে ভাঙনের অধিকাংশ  শেষ । উত্তর ও দক্ষিণ খাসপুখুরিয়া, রেহাইপুখুরিয়া, চর নাকালিয়া, চর বিনানই, হাটাইল, পাথরাইল, চৌবাড়িয়া, সম্ভুদিয়া, মেটুয়ানী, হাপানিয়া ও চর সলিমাবাদসহ অসংখ্য গ্রাম ভাঙনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে।
‎স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, চলতি মৌসুমেই প্রায় পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হারিয়ে গেছে প্রায় তিন হাজার বিঘা ফসলি জমি। একসময় যেখানে ছিল সবুজ ফসলের মাঠ ও জনবসতি, সেখানে এখন শুধু যমুনার বিস্তীর্ণ জলরাশি।

‎ভাঙনের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার আলো

‎নদীভাঙন শুধু মাটি কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় মানুষের ভবিষ্যৎও। প্রতিবার ভাঙনের পর পরিবারগুলো নতুন করে বসতি গড়ার সংগ্রামে নেমে পড়ে। ফলে সন্তানদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। কেউ বিদ্যালয় পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়, আবার কেউ ঝরে পড়ে শিক্ষার মূলধারা থেকে।
‎বর্তমানে অন্তত ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এসব প্রতিষ্ঠানও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

‎কবরস্থানও রক্ষা পায়নি

‎যমুনার ভয়াল ভাঙন থেকে রক্ষা পায়নি ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনাও। স্থানীয়দের দাবি, দুই বছর আগে চর সলিমাবাদ দক্ষিণপাড়া কবরস্থানে ভয়াবহ ভাঙনের ফলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫ থেকে ১৬টি কবর থেকে লাশ নদীতে ভেসে যায়। পরে স্বজনরা মরদেহ অন্যত্র স্থানান্তর করে পুনরায় দাফন করেন।
‎মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি ক্লিনিকসহ নানা স্থাপনা নদীর আগ্রাসনে হারিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের ইতিহাস, স্মৃতি ও আবেগ।

‎চিকিৎসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও সংকটে

‎চলতি বছরে খাসপুখুরিয়া থেকে বাঘুটিয়া ইউনিয়নের প্রায় তিন থেকে পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি এবং একটি কমিউনিটি ক্লিনিক।
‎ভাঙনের কারণে চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় পৌঁছাতে এখনো নৌকাই একমাত্র ভরসা। জরুরি রোগী পরিবহন এবং প্রশাসনিক সেবা পাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‎আশ্বাস অনেক, সমাধান কোথায়?

‎নদীভাঙন প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, “চৌহালী উপজেলার ভূতের মোড় এলাকায় নদীতীর সংরক্ষণ বাঁধে ভাঙন দেখা দেওয়ায় সেখানে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলা হচ্ছে।”
‎তিনি জানান, খাসকাউলিয়াসহ দুটি স্থানে বাঁধে ভাঙন দেখা দেওয়ায় ইতোমধ্যে সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
‎তবে তিনি স্বীকার করেন, “কিছু এলাকায় কোনো বাঁধ নেই, কিন্তু নদীতীর ভাঙছে। বাজেট স্বল্পতার কারণে এসব স্থানে এখনই সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।”

‎স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় চৌহালী

‎বিশেষজ্ঞদের মতে, যমুনার মতো বৃহৎ নদীর ভাঙন মোকাবিলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন পরিকল্পনা, টেকসই নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের পুনর্বাসন। অস্থায়ী ব্যবস্থা দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
‎কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে চৌহালীর মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আরও একটি বছর, আরও একটি গ্রাম, আরও কিছু স্বপ্ন।
‎আজও যমুনার তীরে দাঁড়িয়ে অসহায় চোখে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে মানুষ। কেউ ঘর সরানোর প্রস্তুতি নেয়, কেউ শেষবারের মতো নিজের উঠোনে দাঁড়িয়ে স্মৃতিগুলোকে বিদায় জানায়।
‎সরকার বদলায়, সময় বদলায়, উন্নয়নের গল্প বদলায়। কিন্তু চৌহালীর মানুষের চোখের জল, নদীভাঙনের ভয় আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ যেন একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে। যমুনা আজও গিলে খাচ্ছে মাটি, আর সেই মাটির সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে চৌহালীর মানুষের জীবনভর গড়ে তোলা স্বপ্ন।

--------------------------------
(মো:জিসান রহমান / মাভাবিপ্রবি প্রতিনিধি)